Pegasus-the most dangerous software. প্যাগাসাস দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর সফটওয়্যার

Pegasus-“প্যাগাসাস দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর সফটওয়্যার”

Pegasus
Pegusas

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো প্যাগাসাস কেলেঙ্কারির ঘটনা, যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এবং প্রযুক্তি জগৎ কে আলোচনা-সমালোচনায় ব্যাতিব্যস্ত রাখছে।

দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সব থেকে প্রয়োজনীয় এবং ব্যবহৃত কোনো বস্তুর কথা জিজ্ঞেস করা হলে আমরা অধিকাংশ সময় ই উত্তরে বলে থাকি মোবাইল ফোনের কথা! রোজকার জীবনের কত ইনফরমেশন, ছবি, কনভার্সেশন, ফাইল আমরা ফোনের ভেতর নিয়ে ঘুরি। সেসব নিরাপদে রাখার জন্য আমাদের চেষ্টারও কমতি নেই। কত অসংখ্য বিচিত্র লক, প্যাটার্ন, পিন, পাসওয়ার্ড দিয়ে আমরা সবসময় সুরক্ষিত রাখতে চেষ্টা করি আমাদের প্রিয় ফোন টিকে এবং ফোনের ভেতর থাকা তথ্য গুলোকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সত্যি ই কি এসব করে কোনো লাভ হয়? আদৌ কতটুকু সুরক্ষিত আছে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ফোন টি? কতটুকু সুরক্ষিত আছে আমাদের মুঠোফোনে থাকা বিভিন্ন ফাইল গুলো?
আমরা কি কখনো ভাবতে পারি, যে আমাদের অজান্তেই আমাদের মোবাইল ফোনে থাকা সকল তথ্য পাচার হয়ে যেতে পারে কোনো এক বা একাধিক হ্যাকারের কাছে, তাও আবার কোনো প্রকার কসরত করা ছাড়াই!

বিংশ শতাব্দীর এ সময়ে এসে প্রযুক্তির কল্যাণে সব ই সম্ভব। তবে সবসময় তা কল্যাণকর কিনা তা এক বড় প্রশ্ন বৈ কি!
প্রযুক্তির এমন ই এক উদ্ভাবন হলো প্যাগাসাস স্পাইওয়্যার।

প্যাগাসাস হলো ইসরায়েলি সাইবার আর্মস সংস্থা- সংক্ষেপে (এনএসও) গ্রুপ দ্বারা নির্মিত একটি স্পাইওয়্যার, যা গোপনে মোবাইল ফোনের আইওএস এবং অ্যান্ড্রয়েডের বেশিরভাগ নতুন সংস্করণে যুক্ত করে ইনস্টল করা থাকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য। এছাড়াও নতুন সংস্করণের বাইরেও যেকোনো মোবাইল ফোন (এন্ড্রয়েড কিংবা আইফোনে) প্যাগাসাস ইন্সটল করার জন্য হ্যাকাররা ব্যবহার করে বিভিন্ন অভিনব পদ্ধতি। এজন্য শুধু মাত্র একটি ফোন কল কিংবা লিংকে প্রবেশ ই হতে পারে কারো গোপনীয়তার কাল!

শুরুর দিকে বিশ্বজুড়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ফোনে গোপন নজরদারি চালানোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো প্যাগাসাস স্পাইওয়্যার। প্যাগাসাস যদি কোনো ভাবে একবার আপনার ফোনে ঢুকে যেতে পারে তাহলে আপনার অজান্তেই এই ম্যালওয়্যারটি আপনার ফোনকে ২৪ঘন্টা একটি নজরদারি যন্ত্রে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে।
বর্তমান বিশ্বে অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার সফটওয়্যার গুলোর মধ্যে প্যাগাসাসকে সবচাইতে কার্যকর বলে মনে করা হয়। এই সফটওয়্যার টি আইওএস এন্ড্রয়েড সহ অন্যান্য সকল স্মার্টফোনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে। একবার যদি এই ভাইরাস আপনার মোবাইল ফোনে প্রবেশ করে তবে আপনার ফোনে আপনি যত মেসেজ বা ছবি পাঠান কিংবা রিসিভ করুন না কেন, প্যাগাসাস তা কপি করে গোপনে পাচার করে পাঠিয়ে দেয়। এই স্পাইওয়্যারটি আপনার অগোচরে আপনার কথাবার্তা রেকর্ড করতে পারে, এমনকি আপনার ফোনের ক্যামেরা ব্যবহার করে আপনার ভিডিও রেকর্ড করতে পারে। আপনি কোথায় আছেন, কোথায় গিয়েছিলেন, বা কার কার সাথে দেখা করেছেন প্যাগাসাস সেই সম্পর্কেও জানতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আপনি হয়তো হাতের কাছে ফোন রেখে কারো সাথে কথা বলছেন, প্যাগাসাস সেই মুহূর্তে আপনার ফোনের মাইক্রোফোনকে চালু করে আপনার অজান্তেই সে সমস্ত আলাপ রেকর্ড করতে পারে। ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে শুরু করে কল লিস্ট, কল লগ, কে কাকে কি এসএমএস করেছে সম্পূর্ণ তথ্য প্যাগাসাস দ্বারা চলে যায় হ্যাকারের কাছে। আর তাই বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও এটি একটি আতংকের নাম।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কিভাবে কারো ফোনে প্যাগাসাস ইন্সটল করে হ্যাকার’রা? উত্তর টি সহজ এবং ভয়ংকর।
আপনি জানলে অবাক হবেন যে, আপনার ফোনে প্যাগাসাস নামের এ আতংক টি হ্যাকার বাহিনী ইন্সটল করে আপনার ই মাধ্যমে! তার জন্য তাদের তেমন কোনো খাটুনি করতে হয় না। শুধুমাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা অপরিচিত কোনো একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল রিসিভ কিংবা অপরিচিত কারো দেয়া স্প্যাম লিংকটি তে ক্লিক করার মাধ্যমে আপনি নিজেই প্যাগাসাস ইন্সটল করে নিচ্ছেন নিজের প্রিয় মুঠোফোন টিতে। আর তারপর থেকেই আপনার যাবতীয় তথ্যাদি, দৈনন্দিন জীবন ধারণ, গোপনীয়তা –সবকিছুই চলে যাচ্ছে হ্যাকার দের নখদর্পনে!
২০১৯ সালের এক সার্ভে তে জানা যায়, অপরিচিত কল রিসিভ কিংবা লিংকে ক্লিক করার মতন সাধারণ কৌশল ছাড়াও হ্যাকার’রা অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করেও আপনার গোপনীয়তা আয়ত্ত্ব করে ফেলতে পারে নির্দ্বিধায়। এজন্য তারা আপনার নিকটস্থ ওয়্যারলেস ট্রান্সিভার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ফোনটির সব ইনফরমেশন কব্জা করে ফেলে।
আর একবার আপনার ফোনে প্যাগাসাস সফটওয়্যার টি ইন্সটল হয়ে গেলে আপনার মালিকানায় থাকা ফোনটি তে আপনি যা যা করতে পারবেন, তা তো বটেই, বরং, আপনার করার পরিধির বাইরেও আরো অসংখ্য কার্যাদি এটি সম্পন্ন করে ফেলতে পারবে।
যদিও প্যাগাসাস স্পাইওয়্যারের বিক্রেতা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও দাবি করছে এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে তারা যুক্ত নয়। তারা শুধু আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও বাছাইকৃত সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে এই প্রযুক্তি টি বিক্রি করে আসছে। বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী দেশের সেনাবাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা এনএসও গ্রুপের গ্রাহক। বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনে আড়ি পেতে তাঁদের সংগৃহীত তথ্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হাতিয়ে নেন। তারপর তা থেকে শুরু হয় নানা রকম ব্ল্যাকমেইল, ইনফরমেশন লিক আর পলিটিক্স।

এ থেকে রেহাই পায় না সাধারণ মানুষেরাও।
যদিও এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য ছিলো মানবাধিকার রক্ষা, যার মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবনযাপনের অধিকার, নিরাপত্তা, ব্যক্তির চলাচলের স্বাধীনতা। তবুও বিভিন্ন গোষ্ঠী এর অপব্যবহার করে থাকে অধিক পরিমাণে, যার স্বীকার হয় অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিও!
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে নানা দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের ফোনে নজরদারি চালানোর ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর ইসরায়েলের বেসরকারী কোম্পানি এনএসও গ্রুপের তৈরি করা এই দুর্ধর্ষ সফটওয়্যার নিয়ে এখন তুমুল তরজা চলছে দুনিয়া জুড়ে। অনেক গণমাধ্যমের নিউজ এবং রিচার্সের পর অভিজ্ঞদের মত অনুযায়ী, বর্তমানে প্যাগাসাস দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর একটি সফটওয়্যার।
ইসরায়েলি এই স্পাইওয়্যার কি বাংলাদেশেও ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা তা এখন পর্যন্ত অস্পষ্ট। এ বিষয়ে বিশ্বের ১৭টি প্রথম সারির মিডিয়া, সাংবাদিকতা বিষয়ক প্যারিস-ভিত্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ফরবিডেন স্টোরিজ‘ এবং সেই সাথে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের পুরোটা এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। অনুসন্ধানে যেসব দেশে ব্যাপক হারে এই নজরদারি চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে তেমন ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু ভারতের নাম রয়েছে। তবে তালিকা আরো লম্বা কিনা তা এখনো অপরিষ্কার।
তবে গোটা বিশ্বে এ ঘটনা গুলো পুঞ্জিভূত করে এত গণমাধ্যম, গবেষণা আমাদেরকে এ ও ভাবতে বাধ্য করায়, যে, কতটুকু ভয়াবহ হলে কেবল মাত্র একটি সফটওয়্যার ইস্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত তোলপাড়, এত নিউজ পোর্টাল সৃষ্টি হতে পারে!
প্যাগাসাস নামের এ স্পাইওয়্যারের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য যতোই সাধু হোক না কেন, এর কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গোপনীয়তা অসুরক্ষিত হয়ে থাকা আমাদের কারোর ই কাম্য নয়। প্রযুক্তির এই নেতিবাচক প্রভাব আমাদের জীবন কে প্রতিনিয়ত করে তুলছে অভিশপ্ত।
কোনো অবস্থাতেই কেউ যদি চুরি করে কারো ফোনে বা ডিভাইসে আড়ি পাতে, সেখান থেকে তথ্য, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতে হাতিয়ে নেয়, তার পেছনের কারণ যা ই হোক না কেন, সেটি গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ কাজ টি একটি অপরাধের আওতাভুক্ত হয়ে পড়ে।
তাই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
সকলের গোপনীয়তা সুরক্ষিত রাখা এবং প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি তাই থেকেই যায়। সেই সাথে থেকে যায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা বিষয়ক এক প্রশ্ন!
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন, সতর্ক থাকুন। এটুকুই কাম্য।

#pegasus

#software

To read other articles: https://tuneoflife.com/blog-2/

Leave a Comment

%d bloggers like this: